This is default featured slide 1 title

Go to Blogger edit html and find these sentences.Now replace these sentences with your own descriptions.

This is default featured slide 2 title

Go to Blogger edit html and find these sentences.Now replace these sentences with your own descriptions.

This is default featured slide 3 title

Go to Blogger edit html and find these sentences.Now replace these sentences with your own descriptions.

This is default featured slide 4 title

Go to Blogger edit html and find these sentences.Now replace these sentences with your own descriptions.

This is default featured slide 5 title

Go to Blogger edit html and find these sentences.Now replace these sentences with your own descriptions.

Saturday, July 27, 2019

বৃষ্টি হৃদয়ে সৃষ্টি করে প্রেম তাই ব্যাকুল হয়ে স্পর্শ করতে চাই প্রেয়সীর হাত

সেই মানসীর উদ্দেশে কখনো কখনো কবিও হয়ে উঠি। নাগরিক জীবনে এই বর্ষার বৃষ্টিতে হয়তো ভেজার সুযোগ হয় না, তবু হয়তো কেউ বলে, ‘চলো ভিজি’। অফিস থেকে বাইরে তাকিয়ে সেদিন খুবই মন খারাপ হয়ে গেল। বাইরে ঝুমবৃষ্টি, অফিসের স্বচ্ছ কাচের ভেতর থেকে দেখছিলাম পানির তোড়। মনে হলো, আকাশ কি ফুটো হয়ে গেল! এই বৃষ্টি মন উথাল করা, এই বৃষ্টি মন কেমন করা। বর্ষা কত কিছু মনে করায়! বিশ্ববিদ্যালয়ে যখন পড়তাম, সে সময় এমন ঝরো ঝরো বর্ষায় আমরা কি হলে, আমাদের রুমে থাকতাম? বৃষ্টিতে ভিজতাম এবং ভিজতাম।

বৃষ্টি হচ্ছে। কিন্তু আমাদের মাথার ওপরে কোনো ছাতা নেই। যখন সঙ্গে থাকে প্রিয় মানুষ, ছাতার মতো বাড়তি একটি বস্তু তখন কে আর সঙ্গে রাখে! স্মৃতিগুলো কয়েক বছর আগের, ছাত্রজীবনের। তবু তা বৃষ্টিতে ধুয়েমুছে পুরোনো হয়নি একটুও। সে সময় ঝরো ঝরো মুখর বাদরদিন শুরু হলে অবধারিতভাবে আমার মুঠোফোনেও উড়ে আসত বৃষ্টি, ‘রিমঝিম শুরু হয়েছে, চল ভিজি।’

তার—মেয়েটির এই এক টুকরো খুদে বার্তার অপেক্ষা। তারপর ঘন বর্ষণ মাথায় করে তার সঙ্গে ক্যাম্পাসের এমাথা–ওমাথা চষে বেড়ানো। বৃষ্টিভেজা পিচঢালা পথ ধরে আমরা ঘুরছি আর আমাদের মুখে মহিনের ঘোড়াগুলি ব্যান্ডের গান: ‘শহরের উষ্ণতম দিনে, পিচগলা রোদ্দুরে বৃষ্টির বিশ্বাস তোমায় দিলাম আজ...’

বৃষ্টির বিশ্বাস আজও ভিজিয়ে দেয় আমাদের। এখন এই ১০টা–৫টার কর্মব্যস্ত দিনে বাস্তবে ভিজতে না পারলেও মনে মনে আমরা ঠিকই ভিজি। আর রবীন্দ্রনাথের মতো করে কেবলই আমাদের মনে হয়, ‘এমন দিনে তারে বলা যায়, এমন ঘনঘোর বরিষায়।’

বাঙালির এই এক ব্যাপার, ষড়্‌ঋতুর বাংলাদেশের প্রতিটি ঋতুই তার মনে প্রভাব রেখে যায়। ফলে বর্ষাকালে ব্যস্ত নগরজীবনে যদি ছিটেফোঁটা বৃষ্টির দেখাও মেলে, বাঙালির মন কেমন করে ওঠে। তবে এখন ঋতুচক্রের মতিগতি বোঝাও দায়। বর্ষার দিনে বৃষ্টির দেখা নেই অথবা বৃষ্টি শুরু হলো বর্ষার মাঝামাঝি এসে—কয়েক বছর ধরে হরহামেশা এমনই ঘটছে।

কিন্তু এই নাগরিক জীবনে আকাশ মেঘলা হলেই ভিজে ওঠে আমাদের মন। তাই বৃষ্টি আসার আগে আগ বাড়িয়ে ফেসবুকের নিউজফিডে অঝোর ধারায় বৃষ্টি নামিয়ে ফেলি আমরা। আমাদের জন্য রবীন্দ্রনাথ তো আছেনই, তাঁর ‘আজি ঝরো ঝরো মুখর বাদরদিনে’ থেকে শুরু করে ‘বাদল–দিনের প্রথম কদম ফুল করেছ দান’—কত কত উদ্ধৃতিতে ঝলমলিয়ে ওঠে ফেসবুক!

শুধু রবীন্দ্রনাথের গান নয়, অঞ্জন দত্তর ‘আমি বৃষ্টি দেখেছি, বৃষ্টির ছবি এঁকেছি’ থেকে শুরু করে পার্থ বড়ুয়ার ‘বৃষ্টি দেখে অনেক কেঁদেছি, করেছি কতই আর্তনাদ, দুচোখের জলে ভাসাব বলে, তোমাকে আজ কাঁদাব বলে’—এসব গান বৃষ্টির দিনে বিভিন্নজন যখন নিজের নিজের অ্যাকাউন্টে শেয়ার করেন, আমাদের মধ্যে আছড়ে পড়ে এক পশলা স্মৃতির বৃষ্টি। যেমন, এই বর্ষার এক টিপ টিপ বৃষ্টির দিনে পার্থর এই গানের লিঙ্কটি পাঠিয়ে এক বন্ধু ইনবক্সে আমাকে লিখল, ‘দোস্ত, রাইনাকে মনে পড়ছে।’

রাইনা এখানে ছদ্মনাম হলেও আমার ওই বন্ধুর জীবনে সে ছিল বাস্তব। তাদের তিন বছরের প্রেম পরিণতি পায়নি।

এমনভাবে বর্ষাকালের এই নাগরিক টাপুরটুপুর হরেক কিছু মনে করায়। আমরা আমাদের মনের সেসব অনুভব কোথায় আর রাখি? সেঁটে রাখি ফেসবুকেই। সেদিন ওই ঘোর বৃষ্টির দিনে ফেসবুকে যখন এলোপাতাড়ি স্ক্রল করছিলাম, চোখ স্থির হলো অচেনা একজনের একটি ছবিতে—খোলা ছাদে কালো চুল ভিজিয়ে তুমুল ভিজছে এক তরুণী। সেই ছবির পাশে লেখা হুমায়ূন আহমেদের চরণ, ‘যদি মন কাঁদে, তুমি চলে এসো এক বরষায়।’

একবার মনে হলো, মেয়েটি কি হুমায়ূন আহমেদের রূপা? ছবিটি কি পোস্ট করেছে কোনো হিমু? কালো চুলের মেয়েটির ছবি এবং হুমায়ূনের কথা মিলেমিশে এমন এক আবহ ঘটে গেল, মুহূর্তেই ভারী হয়ে উঠল মন।

স্বীকার করে নেওয়া ভালো, কোনো এক অজ্ঞাত কারণে বর্ষার দিনে মন ভারী হয়ে ওঠে আমার। আজকাল বৃষ্টি শুরু হওয়ামাত্র ইনবক্সে বর্ষিত হয় বউয়ের খুটখাট, ‘বৃষ্টি হচ্ছে, বাইরে তাকাও। বৃষ্টিতে ভিজবা?’

প্রশ্নটি সে করে বটে, কিন্তু আমরা দুজনেই জানি, বৃষ্টির দিনে দুজন দুই অফিসে বসে ভেজা যায় না। ফলে ইনবক্সের ওই কথাবৃষ্টিই সই।

চিরকালই বৃষ্টি আমাদের হৃদয়ে সৃষ্টি করে কথা। তাই হয়তো প্রেমে ব্যাকুল হয়ে আমরা স্পর্শ করতে চাই প্রেয়সীর হাত, সেই মানসীর উদ্দেশে কখনো কখনো কবিও হয়ে উঠি, কাব্য করে লিখে ফেলি দু–চার বাক্য। আর কবি যদি না–ও হতে পারি, অন্যের কবিতা আওড়াতে তো দোষ নেই:

‘মন মানে না বৃষ্টি হলো এত
সমস্ত রাত ডুবো-নদীর পারে
আমি তোমার স্বপ্নে পাওয়া আঙুল
স্পর্শ করি জলের অধিকারে।’

কী এমন হয়, যদি এই ভরা শ্রাবণে কোনো প্রেমিক উৎপলকুমার বসুর ‘নবধারা জলে’ নামের এ কবিতার কয়েকটি চরণ তার প্রেমিকার করকমলে পাঠায়; ফেসবুক পোস্টের মাধ্যমে বা ইনবক্সের নিভৃত অন্দরে।

বর্ষার বৃষ্টি মনে যেমন মনোরম অনুভব জাগায়, মনে হয় রাস্তায় নেমে ভিজি, তারপর ঘরে ফিরে ইলিশ–খিচুড়ির রসনায় তৃপ্ত করি মুখ; একইভাবে এ বর্ষার বেধড়ক বর্ষণের ‘সন্ত্রাস’ দুর্ভোগ আর বিঘ্নও কম ঘটায় না; প্রবল বৃষ্টির ফলে এখন যেমন দেশের অনেক জায়গা ভেসে যাচ্ছে, শুরু হয়েছে বন্যা। ঘরভাঙা মানুষের চোখের পানি আর বৃষ্টির পানি একাকার হলে নাগরিক বর্ষার আকুল করা অনুভব নিশ্চয় আর জাগে না তাদের মনে। তবে বৃষ্টিসৃষ্ট বন্যায় মানুষই কিন্তু আবার মানুষের পাশে দাঁড়ায়; মানুষ হয়ে, মানুষের পাশে এসে, ভালোবেসে এখন যেমন দাঁড়িয়েছেন অনেকেই।

বর্ষা আদতে তাহলে প্রেমেরই বিষয়, মন কেমন করা ব্যাপার। তা না হলে মেঘ ঘন হলে আষাঢ়–শ্রাবণ মাসে আমাদের মন কেমন কেমন করে ওঠে কেন? তাই তো এই মুঠোফোন–ফেসবুক আচ্ছন্ন যুগেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসটিতে বা অন্য কোনো শিক্ষায়তনে কোনো কোনো উচ্ছল তরুণ–তরুণীকে এখনো নির্ভাবনায় ভিজতে দেখা যায়। আর পরস্পরকে তারা এখনো বলে পুরোনো সেই কথাটি, ‘এমন দিনে তারে বলা যায়।’ এরপরই গুনগুনিয়ে ঝুমবৃষ্টির মধ্যে তারা হয়তোবা গেয়ে ওঠে এই সময়ের শিল্পী মিনারের গান:

‘তুমি আমায় ডেকেছিলে
এক মেঘে ঢাকা দিনে
কেন আমি দিইনি সাড়া?
আমার চোখে আকাশ দেখে
তুমি বলেছিলে কিছু
বুঝিনি কেন সেই ইশারা...।’

Friday, March 22, 2019

আপনার সন্তানের আবেগীয় বন্ধনে কেটে যাক অন্ধকার

১. ছেলে যত বড় হচ্ছে, ততই যেন বাবার শঙ্কা বাড়ছে। কারণ, বিভিন্ন বিষয়ে ছেলে নিজের যে মতামত দিচ্ছে, সেগুলোর মধ্যে অনেক মানুষের আচার, রীতিনীতির প্রতি অবজ্ঞা প্রকাশ পাচ্ছে। কখনো উগ্রবাদী মতও প্রকাশ করছে ছেলে। জিজ্ঞেস করলে বলে, বাড়ির এক বয়োজ্যেষ্ঠ ব্যক্তি তাকে ওই বিষয়ে এ রকম নেতিবাচক ধারণা দিয়েছেন।

২. কিছুদিন আগে কলেজের প্রিন্সিপাল ফোন দিয়ে মাকে জানিয়েছেন, প্রথম বর্ষে ভর্তি হওয়া কিছু ছাত্রকে র‌্যাগ দেওয়ার নামে মারধর করেছে তাঁর ছেলে। এ ব্যাপারে জানতে চাইলে ছেলে নির্বিকারভাবে উত্তর দিয়েছে, ‘মা, ওরা তো বাঙালি না, অন্য জনগোষ্ঠী!’ শুনে মা তো হতভম্ব।
ওপরের দুই ছেলের মতো আরও অনেকের মধ্যেই এ বয়সে বর্ণবাদ, সাম্প্রদায়িকতা বা লিঙ্গবৈষম্যের মতো বিষাক্ত বিষয়গুলো শিকড় ছড়াতে শুরু করে। এ থেকেই পরবর্তী সময়ে জন্ম নেয় অসহিষ্ণুতা ও উগ্রবাদ। এসব তৈরিতে আবার কখনো কখনো চেনাজানা কোনো ব্যক্তিই ভূমিকা রাখেন। সহিংস উগ্রবাদের শুরুতেই থাকে মতামত বা আদর্শগত ভিন্নতা নিয়ে ভুল ধারণা, ধোঁয়াশা। এই ধোঁয়াশা কাটিয়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে পরিবার।

স্পষ্ট ধারণার শুরু এখানেই

পরিবারের বড়রা, বিশেষত মা-বাবা যদি ছোটবেলা থেকেই সাম্যের চর্চা করতে শেখান, তবে মানুষের ভিন্নতাগুলোও সন্তানদের চোখে সহজাত মনে হবে। সন্তানের বেড়ে ওঠার সময়টিতেই তাকে বলুন অন্য মতবাদ, অন্য আদর্শের সঙ্গে একমত হওয়া জরুরি নয়, তবে ভিন্নমতের প্রতি যেন থাকে তার শ্রদ্ধা। বৈচিত্র্য আছে বলেই যে পৃথিবী সুন্দর, তা আপনার সন্তান জানুক পরিবার থেকে।

বন্ধন হোক আরও দৃঢ়

সহিংস উগ্রবাদ নিয়ে গবেষণারত সুইডিশ বিশেষজ্ঞ ম্যাগনাস র‌্যানস্টর্প মনে করেন, উগ্রবাদ একধরনের চূড়ান্ত বিধ্বংসী ক্যালাডাইস্কোপ, আর ‘পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া’, ‘অস্তিত্বের সংকট’ এর অন্যতম। পরিবারে বঞ্চনার শিকার হলে সন্তান বিপথে চলে যেতে পারে। কারণ, হতাশাগ্রস্ত মানুষকে সহজেই সহিংস উগ্রবাদের দিকে নিয়ে যাওয়া যায়। পরিবারের আবেগীয় বন্ধনগুলো তারা বুঝতে পারে না। তাই আমরা সবাই যে যার জায়গা থেকে যেন চেষ্টা করি পরিবারে আরও একটু সময় দিতে। কেননা, একসঙ্গে সময় কাটানোর এ অভ্যাসই হয়তো আপনার সন্তানকে বিচ্ছিন্নতাবাদ বা অস্তিস্ত্বের সংকটের মতো ভয়ংকর বিপর্যয় থেকে রক্ষা করবে।

চর্চা হোক যুক্তির

যা চাইছে তা দিয়ে দেওয়া মানেই সন্তানকে ভালোবাসা নয়, এটা বুঝতে হবে মা–বাবাকে। এ ধরনের পরিবেশে বড় হওয়া সন্তানেরা অনেক সময় নিজের দাবি বা চাহিদা মেটাতে অপরাধে জড়িয়ে পড়তেও কুণ্ঠাবোধ করে না। অভিভাবকত্ব এ ব্যাপারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
এ ব্যাপারে সেভ দ্য চিল্ড্রেনস ইন বাংলাদেশের চাইল্ড প্রটেকশন অ্যান্ড চাইল্ড রাইট গভর্নেন্স–বিষয়ক পরিচালক আবদুল্লা আল মামুন বলেন, ‘মনে রাখতে হবে, সন্তানকে “না” বলে দিয়ে কোনো কিছু আসলে থামানো যায় না। যখন সে ভুল বা ক্ষতিকর কিছু করতে যাচ্ছে, তাকে এর খারাপ দিকগুলো বলুন, জানান যে এ ছাড়া কিন্তু আরও চারটি অপশন আছে। অর্থাৎ তাকে যৌক্তিক সিদ্ধান্ত নিতে সহযোগিতা করুন, সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেবেন না।’

নিশ্চিত করুন পারিবারিক সম্প্রীতি

উপমহাদেশের পরিবারগুলোতে শাসন মানে অনেক ক্ষেত্রেই শারীরিক বা মানসিক নির্যাতন। অথচ এ ধরনের আচরণের ফলে সন্তান আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠতে পারে না, ভবিষ্যতে তার ব্যক্তিত্ব বিকাশে ব্যাঘাত ঘটে। এ ছাড়া পরিবারের মানুষের মধ্যে ঝগড়া-হিংসা-বিদ্বেষ দেখে বড় হওয়া শিশুরা এসবকেই সহজাত হিসেবে গ্রহণ করে। অনেক পরিবারেই নারীর দুর্বল ভূমিকা থেকে সন্তানেরা শেখে নারীকে অপমান করার সংস্কৃতি, যা পরবর্তী সময়ে ইভ টিজিং থেকে শুরু করে গুরুতর সহিংস ঘটনার সূত্রপাত ঘটাতে পারে। এ ব্যাপারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এডুকেশনাল অ্যান্ড কাউন্সেলিং সাইকোলজি বিভাগের চেয়ারপারসন মেহেজাবিন হক বলেন, ‘ছোটবেলায় যখন তার সামনে বাবা মাকে মারছে কিংবা মা তাকে মারছে, এ বিষয়গুলো মনে প্রভাব পড়ে, অবচেতনভাবেই সে-ও তার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে একই আচরণ করে। সেটা তার অভ্যাসে পরিণত হয়, নিজের প্রতি নিয়ন্ত্রণ আনতে পারে না।’

আলোচনায় কেটে যাক ভ্রান্তি

পরিবার থেকে উদারতার শিক্ষা পাওয়া সত্ত্বেও অনেক সময় বন্ধুদের চাপে বা ‘পিয়ার প্রেশার’-এ সন্তানেরা এমন কিছু করে বসে, যা উগ্রবাদী আচরণ। তাই বাড়িতেই সন্তানের সঙ্গে নিয়মিত কথা বলুন, জানুন তার মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তনগুলো। এ সম্পর্কে মেহেজাবিন হক বলেন, মা–বাবার সঙ্গে সব কিছু যেন সে শেয়ার করে, এমন পরিবেশ তৈরি করতে হবে। এমনকি সন্তান যদি কোনো সহিংস আচরণে জড়িয়েও যায়, তা আড়াল করার চেষ্টা করবেন না। বরং তাকে তার ভুলটি বুঝিয়ে বলুন, প্রয়োজনে কাউন্সেলিং ইউনিট বা যথাযথ কর্তৃপক্ষের সহায়তা নিন।

যে বয়সে মানুষের ব্যক্তিত্বের বিকাশ ঘটে, সে সময় তার সবচেয়ে বড় আশ্রয় পরিবার। নেতিবাচক আবেগ বশে এনে ইতিবাচক আবেগের বিকাশ ঘটানোর চর্চা তাই পরিবার থেকেই শুরু হয়। শুধু তা–ই নয়, ভুলপথে এগিয়ে গেলেও ফিরে আসার অপেক্ষায় থাকেন পরিবারের লোকজনই। প্রতিটি পরিবার হয়ে উঠুক উদারতার প্রথম শিক্ষাকেন্দ্র আর নির্ভরতার আশ্রয়।

Wednesday, January 30, 2019

কেন খুব ব্যস্ত সময় কাটছে পিয়া ?

খুব ব্যস্ত সময় কাটছে তাঁর। একদিকে বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগের (বিপিএল) উপস্থাপনা, অন্যদিকে নতুন ব্যবসায় উদ্যোগ চালু হবে সামনের মাসে। গত মাসে তিনি বার কাউন্সিলের সনদপত্রও পেয়েছেন। পুরোদস্তুর কাজের মৌসুম চলছে মডেল, উপস্থাপক, আইনজীবী ও ব্যবসায়ী পিয়ার।

সাক্ষাৎকারের জন্য সময় মিলছিল না। অবশেষে ২৭ জানুয়ারি মধ্যরাতে অধুনার কাছে ধরা দিলেন। শুরুতেই বললেন, ‘এখনো কাজ করছিলাম। আসলে সামনের মাসে আমার কো-ওয়ার্কিং স্পেসের (ভাড়া নিয়ে অনেক জন মিলে কাজের জায়গা) উদ্বোধন। চলছে বিপিএলও। ১ ফেব্রুয়ারি বিপিএলের খেলার দিন একটি পরীক্ষাও আছে আমার। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএতে এক্সিকিউটিভ এমবিএ কোর্সের ভর্তি পরীক্ষা।’ একনিশ্বাসে সব বলে ফেললেন জান্নাতুল ফেরদৌস পিয়া।

বেশি উচ্চতার ভালোমন্দ

‘মাঝেমধ্যে মনে হয় আমি মডেল না হয়ে অন্য কিছু হলে আরও বেশি ভালো করতাম। কিন্তু সবচেয়ে কাছের মানুষ আমার স্বামী ফারুক হাসান প্রায়ই বলেন, “তুমি মডেলিং বেছে নাওনি। মডেলিং তোমাকে বেছে নিয়েছে।” এমনি এমনি অবশ্য তিনি এ কথা বলেননি। যুক্তি দিয়ে আমাকে বুঝিয়েছেন। উচ্চতা, ছিপছিপে শারীরিক গঠন, মসৃণ ত্বক, দিঘল কালো চুল—একজন মডেলের যা সবচেয়ে প্রয়োজন, সবই আমার আছে। আর বাংলাদেশে এমন দীর্ঘ উচ্চতার মেয়ের দেখা তো সচরাচর মেলে না। এই উচ্চতাই আমাকে মাত্র ১৬ বছর বয়সে ঢাকায় আসতে বাধ্য করেছিল। আমার জন্য শাপেবর হয়েছিল।’ বললেন পিয়া।

যদিও উচ্চতার জন্য অনেক ব্যঙ্গ সহ্য করতে হয়েছিল তাঁকে। খুলনায় সে সময় এত লম্বা মেয়ে ছিল না। নেতিবাচক কথায় মন ভেঙে যাওয়ায় তাঁর মা এসএসসি পরীক্ষার পর ২০০০ সালে পিয়াকে ঢাকায় রেখে যান। পরিবারের অন্যরা ‘উচ্ছন্নে যাওয়া’ মেয়ের সঙ্গে কথা বলতেন না। মা-ই একমাত্র পিয়াকে সমর্থন করেছিলেন। পিয়া বলেন, ‘কেউ কি বিশ্বাস করবে আমি মডেল হওয়ার জন্য ঢাকায় আসিনি, এসেছিলাম নেতিবাচকতা থেকে বাঁচতে। খুলনায় আমি বাঁচতে পারতাম না। সবার বাঁকা কথা শুনে মাঝেমধ্যে মনে হতো মরে যাই। অত অল্প বয়সে এমন আচরণ কী যে কষ্ট দিত আমাকে!’

পিয়ার কোনো কিছু নিয়েই লুকোচুরি নেই। সোজাসাপ্টা কথা, খোলামেলা পোশাক নিয়ে তাঁকে সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছিল। কিন্তু ‘পাছে লোকে কিছু বলে’—তা আগেও পাত্তা দেননি, এখনো দেন না। কথা শুরুই হয় বিপিএলের অভিজ্ঞতা নিয়ে। কেমন লাগছে? যেহেতু খেলার সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ নেই, হোমওয়ার্ক করতে হয় কিনা? ‘অবশ্যই হোমওয়ার্ক করতে হয়। বাংলাদেশে ক্রিকেট ভালোবাসে না, এমন লোক নেই। অন্য কিছু না দেখলেও খেলা ঠিকই সবাই দেখেন, আলোচনা করেন।’

বিপিএল ধরেই প্রশ্ন এল—আপনাকে নিয়ে ফেসবুকে নানা রকম ট্রল করা হয়েছে। অকপট উত্তর পিয়ার, ‘যখন ট্রলগুলো ভাইরাল হয়েছে, আমি তখনো ব্যাখ্যা দিয়েছি। আবার বলছি, সবাইকে নিয়ে কিন্তু কথা হয় না। ভালো কিছু করলে তাঁকে নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা হয়। বিশেষ করে মেয়েরা ক্যারিয়ারে উন্নতি করলে তাঁদের নিয়ে চারপাশে নেতিবাচক কথা শুরু হয়ে যায়।’

সাক্ষাৎকারের শেষের কথা হতে পারত, তিনি জীবনে শুধু সফল হতে জন্মেছেন। কিন্তু শুরুতেই এটি বলতে হচ্ছে। কাজের মাধ্যমে বাংলাদেশের পতাকা তিনি উড়িয়েছেন বিশ্বাঙ্গনে। পিয়া নিজেও মনে করেন, বয়স ত্রিশ হওয়ার আগে তিনি যা যা করতে চেয়েছেন, সেগুলো সফলতার সঙ্গে করতে পেরেছেন। আক্ষেপ শুধু সিনেমায় কাজ করা নিয়ে, মনে করেন, যতটা ভালো করার কথা ছিল, ততটা করতে পারেননি।

মিস বাংলাদেশ থেকে শুরু

আলোকচিত্রী অপূর্ব আবদুল লতিফের পরামর্শে কলেজে ভর্তি হওয়ার আগেই তিনি মিস বাংলাদেশ প্রতিযোগিতায় ছবি পাঠিয়েছিলেন। নানা প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে সবাইকে অবাক করে দিয়ে ‘মিস বাংলাদেশ ২০০৭’ হয়েছিলেন পিয়া। সেই শুরু হলো। কলেজে পড়ার সময়ই আড়ংসহ বড় বড় সব হাউস ও ব্র্যান্ডের সঙ্গে কাজ করে ফেললেন। কলেজ শেষ হলো। আইনজীবী হওয়ার স্বপ্ন ছিল তাঁর। শেষ পর্যন্ত হয়েছেনও। ঢাকার লন্ডন কলেজ অব লিগ্যাল স্টাডিজ থেকে আইনে পড়াশোনা শেষ করেছেন। পিয়া বলেন, ‘আমি জানতাম, ব্যারিস্টারি পড়তে হলে অনেক টাকা লাগবে। তাই কাজ করে যা সম্মানী পেতাম, জমিয়ে রাখতাম। যা-ই হোক, ২০১১ সালে দক্ষিণ কোরিয়ার ওয়ার্ল্ড মিস ইউনিভার্সিটি প্রতিযোগিতায় অংশ নিই। এটা আমার জীবনের টার্নিং পয়েন্ট।’

নতুন অভিজ্ঞতা

কোরিয়ায় গিয়ে নতুন এসব পেশাগত শব্দের সঙ্গে পরিচয় হলো পিয়ার। কথা হলো, ইতালির একটি নামকরা মডেল এজেন্সি জে এজেন্সির সঙ্গে। তাদের এজেন্সির মডেল হওয়ার প্রস্তাব পান তিনি।

নতুন এক অভিজ্ঞতার কথা শোনালেন তিনি। ‘সেখানে আমাকে প্রথম দিন বলা হলো, আমার শরীরের মাপ দিতে হবে। আমি মাপ দিতে দাঁড়িয়ে পড়লাম। ওরা বলল, পোশাক খুলে মাপ দিতে। ভড়কে গেলাম। ধাতস্থ হতে সময় লেগেছিল। তবে এই প্রতিযোগিতায় বিকিনি পরা আবশ্যিক ছিল না। কেউ চাইলে পরতে পারবে। আমার অস্বস্তি লেগেছিল, তাই আমি পরিনি। ভেবেছিলাম হয়তো এমন কোনো পরিস্থিতিতে পড়তে হবে না। কিন্তু যখন ওপরের অন্তর্বাসও খুলতে বলল, আমি বলেছিলাম, এটা না করলে কি কোনো সমস্যা হবে? বাংলাদেশে তো এসব পরেই মাপ দিই। ওরা বিরক্ত হয়েছিল। পোশাকের মাপ যেন ঠিকঠাক থাকে, সে কারণে তাদের কথামতো মাপ দিতে হলো। অদ্ভুত ব্যাপার, এই বিষয়টি ওদের কাছে এতই সহজ আর স্বাভাবিক যে মনে হলো কোনো যন্ত্রের মাপ নিচ্ছে যেন। আমার শরীরের দিকে অন্য কোনো দৃষ্টিতে একবারও তাকায়নি। পেশাদারি দৃষ্টিভঙ্গি হয়তো একেই বলে।’

সাহসের সঙ্গে এগিয়ে চলা

স্পেনে মাদ্রিদ কালচারাল ফেস্টিভ্যালে কাজ করেছেন। ২০১৩ সালে ইন্ডানিয়ানা প্রিন্সেস মুম্বাইতে সেরা সুন্দরীর মুকুট ওঠে তাঁর মাথায়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে ৪৭ জন প্রতিযোগী অংশ নেন। এখানেও অনেক গল্প আছে তাঁর। প্রথম বিকিনি পরতে বলা হয়। তিনি কর্তৃপক্ষকে জানালেন, বাংলাদেশের সামাজিক পরিস্থিতিতে বিকিনি পরলে সমস্যা। এমন অপ্রত্যাশিত কথা শুনে তাঁরা খেপে গেলেন। বললেন, এটা প্রতিযোগিতার অংশ। আর এটা শর্তের মধ্যে ছিল। পিয়া সিদ্ধান্ত নিলেন, বিকিনি পরবেন। ভাবলেন, কোনো অন্যায় করছেন না। অন্য দেশের সবাই তো পরছে। আমি এখানে থাকা মানে বাংলাদেশকে বিশ্বের কাছে তুলে ধরা। রাজি হয়ে গেলেন।

এই প্রতিযোগিতার ছবি ফেসবুকে প্রকাশ করার পর ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছিল। দৃঢ় মানসিকতার মানুষ পিয়া বলেন, ‘আমার শরীর নিয়ে বা শারীরিক গড়ন নিয়ে আমি আত্মবিশ্বাসী। কোনো পোশাকে কোনো অস্বস্তি হয় না।’

বিশ্বখ্যাত ভোগ সাময়িকীর (ভারত সংস্করণ) প্রচ্ছদের মডেল হয়েছেন। ২০১৮ সালে স্পেনে আরেকটি বিকিনি ফটোশুট করে আসেন।

পিয়া বলেন, ‘পরিবারে শান্তি ও সমর্থন থাকলে নির্বিঘ্নে কাজ করা যায়। বিয়ের পর স্বামী খুব সমর্থন দেন আমাকে। তাই শুধু এগিয়ে চলছি…।’

Saturday, January 19, 2019

কেন ভালোবাসা বা প্রেম কখনই মরে না ?

ধরুন, হঠাৎ দেখা হয়ে গেল রেলগাড়ির কামরায় বা বাসস্ট্যান্ডে। এমনকি হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের সামনেও হতে পারে। অন্তত দশ বছর পর। চেহারায়, আদলে পরিবর্তন ঘটেছে অনেক। প্রাণবন্ত, চঞ্চল ছিপছিপে তরুণীটি এখন কিছুটা পৃথুলা, পূর্ণবয়স্ক নারী। সংসার-সন্তান সামলে পরিণত জীবনের অভিজ্ঞতার রেখাগুলোকে আড়াল করতে পারেনি প্রসাধনের প্রলেপ। কিন্তু এই নারীকে না চেনা তো অসম্ভব! চমকে উঠেছেন আপনি। ভেবেছেন দ্রুত নিজেকে আড়াল করবেন কিনা। কিন্তু ততক্ষণে চোখাচোখি হয়ে গেছে। আর আপনাকে অবাক করে দিয়ে হাত তুলে ডাকল। খুব সহজ-স্বাভাবিক গলায় জানতে চাইল, ‘কেমন আছ?’

‘ভালো। তুমি?’

এরপর পরস্পরের সংসার-সন্তানের কুশলাদি বিনিময় হলো।

আপনার মনে তখন স্মৃতির তোলপাড়। তাঁর মনের অবস্থা অবশ্য বোঝার উপায় নেই। হঠাৎ রবীন্দ্রনাথের কবিতার নারী হয়েই যেন সে জানতে চাইল, ‘আমাদের গেছে যেদিন, একেবারেই কি গেছে?’

কী উত্তর দেবেন আপনি, সেই রবীন্দ্রনাথের কবিতা ধার করেই বললেন, ‘রাতের সব তারাই আছে দিনের আলোর গভীরে।’

দশ বছর পর দশ মিনিটের এই আলাপের পর আবার দুজনার দুটি পথ দুটি দিকে গেল বেঁকে। শুধু একটি দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল বুক ফুঁড়ে। কত কথা ভিড় করে আসে মনে। চলচ্চিত্রের ফ্ল্যাশব্যাকের মতো অনর্গল ছবির পর ছবি ভেসে ওঠে। টিকিট হাতে সিনেমা হলের সামনে অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকার দিন, লাইব্রেরির বারান্দায় বসে দুজনের ঘনিষ্ঠ মুহূর্তগুলো কিংবা নদীর কিনারে বসে দিগন্তলাল সূর্যাস্তের দিকে তাকিয়ে রঙিন ভবিষ্যতের স্বপ্ন বোনা...।

এর আগেও যে কখনো-সখনো ওর কথা মনে পড়েনি এমন তো নয়। কিন্তু আজ সে রাতের মতো স্মৃতিরা যেমন করে ছুটে আসছে, আগে তো এ রকম হয়নি।
এ রকম আপনার আমার সবার হয়। মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, এর নাম ‘রিট্রাইভাল কিউ।’ একটি সূত্র আপনাকে ফিরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে স্মৃতির কাছে। যেমন একটি চাবি হয়তো খুঁজে পাচ্ছিলেন না দীর্ঘদিন। হঠাৎ করে একটা বাক্স দেখে স্মৃতিটা উসকে উঠল, আরে এই বাক্সের মধ্যেই তো ছিল চাবিটা। অর্থাৎ বাক্সটা ছিল সূত্র।

কেন ভেঙে যায় প্রেম? কেন দূরে সরে যাওয়া? সাধারণভাবে প্রেমের কয়েকটি শর্ত আছে। কাছাকাছি থাকা, দায়বদ্ধতা ও বিশ্বাস। এর কোনো একটির অনুপস্থিতি বা ঘাটতি থেকে ভাঙন ধরে।

* কাছাকাছি থাকার ব্যাপারটিকে অবহেলা করা যায় না। বলা হয়, ছোট ছোট বিচ্ছেদ প্রেমকে গভীর করে দীর্ঘ বিচ্ছেদ প্রেমের মৃত্যু ঘটায়। দীর্ঘকাল প্রেমাস্পদের নৈকট্য বঞ্চিত হলে প্রেমের করুণ পরিণতি ঘটতে পারে।

* হালকা চালে একটা সম্পর্ক গড়ে উঠল। কিছুদিন একজনের সঙ্গ উপভোগ করলাম, কিন্তু কোনো ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নেই, পরস্পরের প্রতি দায়বদ্ধতা নেই—এ রকম সম্পর্ক দীর্ঘস্থায়ী হয় না।

* বিশ্বাস হচ্ছে যেকোনো সম্পর্কের মূল ভিত্তি। সন্দেহ ও অবিশ্বাসের কারণে সম্পর্কের সুতোটি ছিঁড়ে যায়।

এসব ছাড়া অনেক সময় বাহ্যিক কারণেও প্রেমের করুণ সমাপ্তি ঘটতে পারে। অভিভাবকদের জোরজবরদস্তি বা সামাজিক রীতির তীব্র ভ্রুকুটিও প্রেমিক যুগলকে পৃথক করতে পারে পরস্পরের কাছ থেকে।

মন ভাঙে, প্রেমাস্পদ দূরে সরে যায়। কিন্তু প্রেম তো মরে না। মনের গহিন কোণে, যাকে আমরা বলি অবচেতন, সেখানে সুপ্ত অবস্থায় থেকে যায়। ‘রিট্রাইভাল কিউ’র উসকানি পেলে আবার জেগে ওঠে সেই প্রেমের স্মৃতি। তবে সেই স্মৃতি আঁকড়ে ধরেই মানুষ বেঁচে থাকে, তা-ও কিন্তু নয়। আবেগের কেন্দ্র থাকে মস্তিষ্কে। নতুন আবেগ এসে ঢেকে দেয় পুরোনো আবেগকে। ঢেকে দেয় বলে পুরোনো প্রেমের কথা ভুলে সুখের দাম্পত্য জীবন গড়ে তুলতে পারে মানুষ। এখানেও প্রেম আছে। আছে স্বামী বা স্ত্রীর প্রতি ভালোবাসা ও বিশ্বস্ততা, সন্তানের প্রতি বাৎসল্য আর সংসার ঘিরে আশা ও আনন্দ।

অনেকেই স্বামী বা স্ত্রীকে তাঁর পূর্ব প্রেমের কথা জানাতে চান না। কারণ, সেটা সহজে গ্রহণ করতে পারেন না স্বামী বা স্ত্রী। কেন তাঁরা এ কথা বোঝার চেষ্টা করেন না যে, মায়ের কোল থেকে পড়েই তো কেউ স্বামী বা স্ত্রীর কোলে এসে পড়েন না। মধ্যখানে এত বড় জীবন ঘটনাবিহীন থাকবে এটা কী করে সম্ভব? তবে বুদ্ধিমানেরা বলেন, পুরোনো কাসুন্দি না ঘেঁটেই যদি দাম্পত্য সম্পর্ক ও সংসার নিরাপদ থাকে, তাহলে না জানানোই ভালো। ‘কে হায় হৃদয় খুঁড়ে বেদনা জাগাতে ভালোবাসে!’

শরৎচন্দ্রের উপন্যাস দেবদাস পড়তে ভালো, সঞ্জয়লীলা বনশালীর চলচ্চিত্র দেবদাসও দেখতে মন্দ নয়। কিন্তু প্রেমের ব্যর্থতায় বাঈজি বাড়ি ঘুরে আসা বা মাতাল হয়ে ‘পারু পারু’ বলে হাহাকারে পার্বতীর বাড়ির সামনে এসে জীবন বিসর্জন আদর্শ প্রেমিকের জীবন হতে পারে না। এ ধরনের চরিত্র মানুষের মনে সাময়িক করুণা জাগায়, সমীহ জাগায় না। এটা মনুষ্যত্বের অবমাননা ছাড়া আর কিছুই নয়।

মনোচিকিৎসক আহমেদ হেলালের পরামর্শ, ইগো-ডিফেন্স তৈরি করতে হবে। ব্যর্থতা, প্রতারণার বোধ থেকে নিজেকে আঘাত করা, নিজের ভবিষ্যৎকে বিপন্ন করা যেমন প্রকৃত প্রেমিকের কাজ হতে পারে না, তেমনি প্রেমাস্পদের সুখের জীবন দেখে ঈর্ষাপরায়ণ বা প্রতিহিংসাপ্রবণ হওয়াটাও দৃঢ় ব্যক্তিত্বের পরিচয় প্রকাশ করে না।

জীবনকে নদীর সঙ্গে যে তুলনা করেন কবি-লেখকেরা, তা এখন ক্লিশে মনে হতে পারে। কিন্তু এই তুলনার মধ্যে যুক্তি আছে। নদীতে ছোট-বড় ঢেউ ওঠে, তা মিলিয়েও যায়। কিন্তু যে ঢেউ নদীর পাড় ভাঙে, সেই আঘাত বা ক্ষতটাই দীর্ঘস্থায়ী হয়।

তবে সবচেয়ে ভালো হয় ‘প্রাক্তন’–এর সঙ্গে সহজ-সুন্দর একটি সম্পর্ক বজায় রাখতে পারলে। আগের মতো আবেগের তীব্রতা নেই, কিন্তু বন্ধুত্বের মাধুর্য আছে। পরস্পরের প্রতি অভিযোগ-অভিমান-ক্ষোভ নেই, নতুন কোনো চাওয়া-পাওয়া নেই, আছে ক্ষমা ও মমতা।


লেখক: যুগ্ম সম্পাদক, কবি ও সাহিত্যিক।

Saturday, January 12, 2019

তাহমিনার প্রথম কথা, এটি তো দুঃখের অভিজ্ঞতা, মজার কোনো ঘটনা নয়?

আলাপের পয়লা কোনো লেখককে আপনি যখন ফ্যাশন নিয়ে প্রশ্ন করবেন, তখন কি তিনি খুশি হবেন, নাকি বিরক্তিতে ভ্রু কুঁচকে মনে মনে বলবেন, লেখালেখি নিয়ে প্রশ্ন না করে এসব কী! হ্যাঁ, ঝুঁকিটি আমরা নিয়েছিলাম। পৌষের সকালে তরুণ কথাসাহিত্যিক তাহমিমা আনামের সঙ্গে কথোপকথনের সূচনায় যখন বললাম, ‘শুরুতে আপনার ফ্যশন নিয়ে কথা বলি। ফ্যাশনের ক্ষেত্রে প্রত্যেক মানুষেরই তো নিজস্ব একটি শৈলী রয়েছে...।’ কথাগুলো শুনে তাহমিমা চুপচাপ, গম্ভীর। ঘরজুড়ে সে সময় নেমে এসেছে নিস্তব্ধতা। স্থান: গুলশানে তাহমিমাদের বাসা। তারিখ: ৫ জানুয়ারি ২০১৯। সময়: বেলা ১১টা।

‘ফ্যাশনের ক্ষেত্রে ওইভাবে নির্দিষ্ট কোনো ধারা মেনে চলি না আমি।’ নীরবতা ভেঙে তাহমিনার প্রথম কথা।

প্রচ্ছদপটে তিন নারী লেখক

দশম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে গেল বছরের মে মাসে প্রকাশিত হারপার’স বাজার ইন্ডিয়ার প্রচ্ছদে ছিল উপমহাদেশের তিন তরুণ নারী লেখকের ছবি। যাঁরা ইংরেজি ভাষায় লিখে বহির্বিশ্বে দারুণ আলোচিত। তিনজনের একজন বাংলাদেশের তাহমিমা আনাম, আ গোল্ডেন এজ লিখে ২০০৮ সালে জিতে নিয়েছিলেন কমনওয়েলথ পুরস্কার। পরে লিখেছেন আরও দুটি বই—দ্য গুড মুসলিম ও দ্য বোনস অব গ্রেস। বাকি দুজন—পাকিস্তানের সংস অব ব্লাড অ্যান্ড সোর্ড বইয়ের লেখক ফাতিমা ভুট্টো এবং ভারতের তিশানী দোশি, কান্ট্রিজ অব দ্য বডি উপন্যাস দিয়ে সাহিত্যের মঞ্চে যাঁর অভিষেক।

অভিজ্ঞতাটা অদ্ভুত

ফ্যাশন সাময়িকীর ব্যক্তিত্ব হিসেবে উপস্থাপিত হওয়ার পরও সত্যিই আপনি ফ্যাশনসচেতন নন? আমাদের প্রশ্ন। বাজার-এ আপনাকে দেখে কিন্তু তা মনে হয়নি। এতক্ষণের গাম্ভীর্য গলে খানিকটা হাসির রেখা ফুটল তাঁর মুখে, ‘ফ্যাশন নিয়ে খুব একটা মাথা ঘামাই না আমি। সাজসজ্জা নিয়ে আমার কোনো রুটিন নেই। মেকআপ করি না, তা বললে ভুল হবে। বরং বলা যায়, করতে পছন্দ করি না। কখনো যদি করিও, তা সাধারণভাবেই করি। আরাম দেয়, এমন কিছুতেই স্বচ্ছন্দবোধ করি। যেহেতু আমি দুই সন্তানের মা, তাই দুটো বাচ্চা সামলে ফ্যাশনের দিকে মনোযোগ খুব কমই দিতে পারি।’

তাহমিমার কথা শেষ হলে আমাদেরও মনে পড়ল, রুমি ও রোকেয়া নামে পাঁচ ও দুই বছর বয়সী দুসন্তানের মা তিনি। তাঁর স্বামী রোলেন্ড ল্যাম্ব লন্ডনের একটি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা। অবকাশ কাটাতে তাহমিমা সম্প্রতি লন্ডন থেকে দেশে এসেছিলেন বাবা-মায়ের কাছে। আমরা যেদিন তাঁর সঙ্গে কথা বলছি, এর পরদিনই এ লেখকের ফিরে যাওয়ার কথা লন্ডনে।
: বাজার ইন্ডিয়া আপনাদের তিন সাহিত্যিককে মডেল করে বিশেষভাবে ফটোশুট করল, আর উপমহাদেশের কোন কোন নারী লেখক আপনাদের অনুপ্রাণিত করেছেন, তা নিয়ে আবার লিখতেও বলল আপনাদের। সাময়িকীটি সচরাচর তো এমনটি করে না। সব মিলিয়ে আপনার অভিজ্ঞতা কেমন ছিল?

: বাজার-এর সম্পাদক একদিন আমার সঙ্গে যোগাযোগ করলেন। বললেন, আমাদের নিয়ে একটি কাজ করতে চান। তারপর তো...
কথা শেষ করেন না তাহমিনা। কিন্তু আমরা বুঝতে পারি এই ‘তারপর তো...’ বাক্যাংশের মধ্যই লুকিয়ে আছে ফটোশুটের কাহিনি।

: আপনি তো পেশাদার মডেল নন, কেমন লাগল ফটোশুট করতে?

: ফটোশুট হয়েছিল লন্ডনের ল্যাংহাম হোটেলে। আমি খুব সাধারণ জীবনযাপনে অভ্যস্ত। মেকআপ করি না, চুল সাজাই না। বলতে পারেন, আমার জন্য এটা একটু অদ্ভুত অভিজ্ঞতাই। আমাদের তিনজনের কিছু একক ছবি তোলা হলো, দলগতভাবে তোলা হলো কিছু ছবি। চারটি ছবির মধ্যে তিনটি ছিল দলীয় আর একটি একক। প্রায় সারাক্ষণই পোশাক বদলাতে হয়েছিল আমাদের। তাই সময়টাও একটু বেশি লেগেছিল। প্রতিটি শট নিতে ধরুন আধ ঘণ্টা-এক ঘণ্টা সময় লেগেছিল। করিডর ধরে হেঁটে যেতে একটি ছবি তোলা হয়েছিল। সেটি তুলতে বেশ সময় লেগেছিল। প্রচ্ছদের ছবি তুলতেও অনেক সময় লাগল। কেননা, কে কোথায় দাঁড়াবে, কীভাবে দাঁড়াবে—এগুলো ঠিক করতে করতেই অনেক সময় লেগে গেল। এভাবে সারা দিন চলে গেল এখানেই। গিয়েছিলাম ভোর ছয়টায়, আর বের হতে হতে সন্ধ্যা ছয় কি সাতটা। একটি অদ্ভুত অভিজ্ঞতা বলতে পারি। ফটোশুটের ওই দিন আমরা সারা দিন কিছুই খাইনি। কেবলই কাজ আর কাজ, এই করিডরে যাচ্ছি তো এই আবার ঘরে। আমাদের সঙ্গে আলোকচিত্রী নরবার্ট নিয়াত—এভাবে দিন যখন প্রায় যায় যায়, প্রচণ্ড ক্ষুধা পেয়ে গেল আমার। কাছের একজনকে বললাম, দয়া করে আমাকে পাশের দোকান থেকে একটা স্যান্ডউইচ এনে দিন। এনে দিল। তারপর আমি ওটা খেলাম। বাকিরা কেউই সারা দিনে কিছুই খায়নি।

: এ তো দুঃখের অভিজ্ঞতা, মজার কোনো ঘটনা নেই?

এবার ও হেনরি পুরস্কারপ্রাপ্ত গল্পকার তাহমিমা আনাম আরেকটু সহাস্য। হাসির রেখাকে আরও খানিকটা দীর্ঘ করতে করতে বললেন, ‘সাদা রঙের যে পোশাকগুলো আমাদের জন্য রাখা হয়েছিল, ওগুলো ছিল আসলে আমার চেয়ে আরও লম্বা উচ্চতার নারীর জন্য। পোশাক নিয়ে বেশ বেগ পেতে হয়েছিল, সব পোশাক মানাচ্ছিল না আমাকে। তবে নানা হাঙ্গামা সত্ত্বেও ওই দিনটা খুব আনন্দে কেটেছে। আমি, তিশানি ও ফাতিমা নারীদের অধিকার নিয়ে কথা বলেছি, তাঁদের বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে কথা বলেছি, সমসাময়িক অন্যান্য সাহিত্যিককে নিয়েও কথা বলেছি।
তাহমিমা এমনভাবে বলছিলেন, সেই সময়টি যেন তাঁর চোখে এখনো ভাসছে। সেই সময় থেকে তাহমিমাকে এই সময়ে নিয়ে এল ছোট্ট একটি প্রশ্ন, আপনার প্রিয় পোশাক কী?
‘যখন যে পোশাকে স্বচ্ছন্দবোধ করি, তা-ই পরি। তবে কোনো অনুষ্ঠানে গেলে অবশ্যই আমার প্রথম পছন্দ শাড়ি। ঢাকার অরণ্যের শাড়ি আর জামদানি—সাধারণত এ দুরকম শাড়িই পরতে পছন্দ করি। শাড়ির মাধ্যমে আমি বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করতে পারি।’ একনিশ্বাসে বলে গেলেন তাহমিমা।

লেখালেখি ও পরিবার

তাঁর ব্যক্তিগত দিনযাপনের খোঁজখবর নিতে চাইলাম আমরা। এ ক্ষেত্রে তাহমিমা উত্তর দিলেন ঠিক ঠিক ঘড়ির কাঁটা মিলিয়ে, ‘আমি থাকি পূর্ব লন্ডনে। ভোর পাঁচটা-ছয়টার মধ্যে রুমী আর রোকেয়া ঘুম থেকে উঠে পড়ে। তাই আমিও উঠে পড়ি। খানিক বাদে রুমীকে স্কুলে নিয়ে যাই। সংগীতের ওপর জোর দেয়, এমন একটি স্কুলে পড়ে ও। এসব করে ঘরে ফিরতে ফিরতে সকাল নয়টা। এরপর থেকে দুপুরের খাবারের আগ অব্দি আমার লেখার সময়। পরে সন্ধ্যার দিকে আমার স্বামীর প্রতিষ্ঠানে বসি। মাসে একবার নাটক দেখতে যাই—এভাবে রুমী-রোকেয়া, লেখালেখি আর পারিবারিক কাজকর্ম করতে করতেই চলে যায় দিন।’

তাহমিমা একজন লেখক, একজন মা; যিনি তাঁর ছেলের নাম রুমী রেখেছেন পারস্যের কবি জালালুদ্দীন রুমীর নামে, অন্যজন মেয়ে রোকেয়ার নাম রেখেছেন নারী জাগরণের পথিকৃৎ বেগম রোকেয়া সাখাওয়াৎ হোসেনের নামে।

Wednesday, January 2, 2019

নতুন বছরে এই তো চাওয়া আনন্দে ঢেকে যাক কষ্ট (গল্পটি লিখেছেন সুমনা শারমীন)

জীবনে দুঃখ–কষ্ট, বেদনা–ব্যর্থতা আসবেই। পাশাপাশি আসবে আনন্দ–সুখ–সফলতা। মানুষের জীবনে আনন্দ–বেদনার এই কাব্যে আনন্দ থাকুক এগিয়ে। কষ্টকে দিক হারিয়ে। সফলতা ঢেকে দিক ব্যর্থতাকে। নতুন বছরে এই তো চাওয়া।

মেয়েটির মনে অনেক কষ্ট। হারিয়েছে তার প্রথম সন্তান। নাড়িছেঁড়া ধন। ভেবেই পায় না কী নিয়ে বাঁচবে সে? বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়স্বজনের অনুরোধে অবশেষে মাস দেড়েক পর ঘরের বাইরে বের হলো সে। সবাই বোঝাল, যাও, মুক্ত বাতাসে নিশ্বাস নিয়ে এসো।

কয়েক বছর আগের কথা। দিনটি ছিল ৩১ ডিসেম্বর। কাল থেকে নতুন বছর। মেয়েটি চোখেমুখে পানির ঝাপটা দিল, মনকে শক্ত করার চেষ্টা করল। কিন্তু বেসিনের আয়না ঝাপসা হয়ে যায় বারবার। আবার পানির ঝাপটা। বহুদিন পর চুল বাঁধল, বাইরে যাওয়ার শাড়ি পরল নাকি শাড়ি প্যাঁচাল! ঢাকার ধানমন্ডির সড়ক দিয়ে রিকশায় যাচ্ছে...। হঠাৎ পাশের রিকশায় দেখল এক জোড়া তরুণ–তরুণী উচ্ছল হাসিতে লুটিয়ে পড়ছে। থমকে গেল মেয়েটা। মনে হলো, ঘরের বাইরে এসে ভুল হলো। বাইরেটা বড় স্বার্থপর! আমার মনে এত কষ্ট, আর দেখো ওরা কেমন নির্লজ্জের মতো হাসছে! কী নিষ্ঠুর!

হায় রে অবুঝ, ওই অপরিচিত তরুণ–তরুণী কী করে জানবে তোমার কষ্টের কথা? আর ঘর থেকে বের না হলে কী করে জানতে পৃথিবীতে একই সময়ে সব মানুষ দুখী নয়! সুখ–দুঃখ সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো, আসে আবার মিলিয়েও যায়। নিজেকে এই কথাটা বোঝাতে সময় লেগেছিল মেয়েটার। আবার মা হয়েছিল মেয়েটি, আশঙ্কা আর আতঙ্কে মাসখানেক ছবি তোলা হয়নি নবজাতকের। ছোট্ট মানুষটি ঘুমিয়ে থাকলে নাকের কাছে বারবার আঙুল নিয়ে দেখত। সব ঠিক আছে তো? অতঃপর সময় বহিয়া গেল, ছোট্ট মানুষটা প্রথম হাসল নাকি হাসাল পরিবারকে! প্রথম মায়ের তর্জনী মুঠো করল, সিলিং পাখার ঘূর্ণি দেখল চোখ ঘুরিয়ে, উপুড় হলো, ঘাড় উঁচু করল...সবটাতেই বিস্ময়, আনন্দ বাবা–মায়ের। একের পর এক ছবি তোলা, বর্ণনা লিখে রাখা।

আমাদের কার জীবনে ভালো–মন্দ নেই? উত্থান–পতন নেই? সফলতা-ব্যর্থতা নেই? তবু জীবন কি থেমে থাকে? একেক সময় মনে হয়, আর তো বইতে পারি না। তবু বড় কোনো বিপদ এলে সবকিছু জেনেও একটা ‘মিরাকেল’–এর অপেক্ষায় থাকি। ধ্বংসস্তূপের মধ্য থেকে ফিনিক্স পাখির উড়ে যাওয়ার স্বপ্ন দেখি। আর যখন রাত পোহালে ভোর হয়, তখন বুঝতে পারি, সময়ই একমাত্র শক্তি। সময়ই পারে দুঃখকে ঢেকে দিয়ে আনন্দে ভাসাতে।

রবীন্দ্রনাথ নাকি বাঙালির মনের আনন্দ-বেদনা, উত্থান-পতনের সব অনুভূতির কথাই লিখে রেখে গেছেন। ঠিক তা–ই।
আছে দুঃখ, আছে মৃত্যু, বিরহদহন লাগে।
তবুও শান্তি, তবু আনন্দ, তবু অনন্ত জাগে।।
তবু প্রাণ নিত্যধারা, হাসে সূর্য চন্দ্র তারা,
বসন্ত নিকুঞ্জে আসে বিচিত্র রাগে।।
তরঙ্গ মিলায়ে যায় তরঙ্গ উঠে,
কুসুম ঝরিয়া পড়ে কুসুম ফুটে।
নাহি ক্ষয়, নাহি শেষ, নাহি নাহি দৈন্যলেশ—

সেই পূর্ণতার পায়ে মন স্থান মাগে।।

ক্রিকেট–বোদ্ধা বন্ধু একবার আমার লাগাতার বিপদের সময় বলেছিল, উইকেট বাঁচিয়ে ক্রিজে টিকে থাকাটাই এখন বড় ব্যাপার। শতরানের আশা এখনই কোরো না। ভুল শট খেলে আউট হয়ে যেতে পারো। বরং ছোট ছোট শট খেলে মধ্যাহ্নভোজের আগে অর্ধশত রান করো। দেখবে, দিন শেষে শতরান হয়ে যাবে! আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে দেখি, জীবনের সঙ্গে ক্রিকেটের এত মিল! তাই তো এক রানের আনন্দও তো অনেক সময় শতরানের মতো। আমরা অনেক সময় তা ভুলেই যাই।
আবার এক রান না পেলে অহেতুক মুষড়ে পড়ি। জীবনে বড় বিপদ এসেই আমাদের মনে করিয়ে দেয়, কত অল্পে আমরা অহেতুক মন খারাপ করি। আনন্দ উদ্‌যাপন করাটাও যে জীবনের অংশ, বড় ঝড় থেকে না ফিরলে মনেই থাকে না।

কেউ হয়তো ভর্তি হতে চেয়েছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে, হলো না। মন তো ভাঙবেই। কিন্তু হাল ছেড়ে দেওয়ারও তো কিছু নেই। মনোবিদেরা বলেন, জীবনে বিকল্প পথও ধরতে হয়। একটা হলো না তো আরেকটা হবে, হয়তো তাতেই হবে বাজিমাত। শিক্ষার্থীরা তো বটেই, অভিভাবকেরাও অনেক সময় ভুলে যান লেখাপড়াটাই আসল কথা। অমুক স্কুলে ভর্তি না হতে পারলে তাঁর সন্তানের ভবিষ্যৎ অন্ধকার হবে, এটা ভাবার কোনো কারণ নেই। প্রথম আলোর দেশজুড়ে থাকা প্রতিনিধি আর ট্রাস্টের কল্যাণে জানতে পারি, কত নাম না জানা বিদ্যালয় থেকে কত অভাবের সঙ্গে লড়াই করে ঈর্ষাজাগানিয়া ফলাফল করছে অদম্য মেধাবীরা।

জীবন তো খেলাই। একবার আউট হলেইবা কী? আরেকবার ছক্কা হবেই। হোক বা না হোক, ছক্কার স্বপ্ন তো দেখতে হবে। যে ‘শচীন শচীন’ নির্ভরতার ধ্বনিতে স্টেডিয়াম মুখরিত থাকত, সেই শচীন টেন্ডুলকার কি হাঁস (ডাক) মারেননি? তাই বলে কি থেমেছে তাঁর অর্জন? প্রথম আলোর কিশোরদের ম্যাগাজিন কিশোর আলোর জন্মদিনে এসে তাই বিশ্বখ্যাত অলরাউন্ডার সাকিব আল হাসান স্বপ্ন দেখালেন বিশ্বকাপ জয়ের। বললেন, ‘স্বপ্ন তো তা–ই, যা অন্যে বিশ্বাস করে না। কিন্তু আমি বিশ্বাস করি।’

আরেকটা নতুন বছর এল। নতুনের শক্তি অনেক। এটা শুধু দেয়াল পঞ্জিকা বা মোবাইলের ক্যালেন্ডারের নতুন মাস নয়। নিজেকে জয় করার প্রত্যয়ও বটে। আর কোথাও কিছু না থাক, বুকের ভেতরে প্রত্যয় থাকলেই যথেষ্ট। তবেই গাইতে পারেন, ‘আমরা করব জয় একদিন।’
মনে পড়ে স্কুলজীবনের কথা। অগ্রণী স্কুলের গানের শিক্ষক মামুন স্যার শিখিয়েছিলেন রবীন্দ্রসংগীতটি—
ওরে, নূতন যুগের ভোরে
দিস নে সময় কাটিয়ে বৃথা সময় বিচার করে।।
কী রবে আর কী রবে না, কী হবে আর কী হবে না
ওরে হিসাবি,
এ সংশয়ের মাঝে কি তোর ভাবনা মিশাবি?।...

কর্মক্ষেত্রই বলুন, পরিবার বলুন, কিংবা বন্ধুত্ব—আনন্দ–বেদনার নকশিকাঁথার ফোঁড়েই জীবন হয় পূর্ণ। তবে দিনশেষে আনন্দের পাল্লা যেন হারিয়ে দেয় কষ্টকে। ব্যর্থতা যেন সফলতার কাছে হয় পরাজিত। নয়তো জীবন জিতবে কী করে বলুন? নতুন বছরে এই তো চাওয়া।

ভালোবাসার গল্প আমি একটি মেয়েকে ভালোবাসি

*আমি একটি মেয়েকে ভালোবাসি। আমাদের সম্পর্ক প্রায় তিন বছর হলেও ভালোবাসার মানুষকে যে কথা বলে মনের তৃপ্তি দিতে হয়, সে তা পারে না। আমরা প্রতিদিন মাত্র ১৫-২০ মিনিট কথা বলতে পারি। আর দেখা হচ্ছে না প্রায় আট–নয় মাস। কিছুদিন ধরে আমার মনে হচ্ছে, সে আমাকে ভালোবাসে না। এই অবস্থায় আমার কী করা উচিত?

নাম ও ঠিকানা প্রকাশে অনিচ্ছুক
*আমি আসলে মানসিক দিক দিয়ে খুব কষ্টে আছি। আমার বিয়ে হয়েছে আজ থেকে ৯ বছর আগে। আমার স্বামী আর আমি দুজনেই সরকারি চাকরিজীবী। আমার এক ছেলে আর এক মেয়ে। সমস্যা হলো বিয়ের দুদিন পর জানতে পারি, আমার স্বামীর সঙ্গে আমার বিয়ের আগে অনেক বছর ধরে একটি ভিন্নধর্মালম্বী মেয়ের সঙ্গে সম্পর্ক চলছে। সেই মহিলা বিবাহিত আর তাঁর দুই বাচ্চা। আমার বিয়ের পরও ওদের সম্পর্কটা ওরা চালিয়ে গেছে। এই নিয়ে দুজনের মধ্যে খুব অশান্তি হতো। সম্প্রতি আমি মহিলার সঙ্গে কথা বলেছি এবং তিনি সব স্বীকার করেছেন। কিন্তু আমার স্বামীকে আমি এখন বিশ্বাস করতে পারছি না। কারণ, আমি ওর মোবাইলে দেখেছি, এখনো দুজনের মধ্যে প্রতিদিন কথা হয়। যার কারণে আমার স্বামী ঘরে আমার ওপর খুব মানসিক অত্যাচার চালাচ্ছে। বলে রাখি, বিয়ের অনেক আগে এক ছেলের সঙ্গে আমার সম্পর্ক ছিল। ছেলেটা আমাকে খুব ভালোবাসত। আমার পরিবার ওকে মেনে নেয়নি। যার কারণে আমিও আর এগোইনি। এখন আমার স্বামী আমার এক আত্মীয়ের কাছ থেকে ব্যাপারটা জেনে গেছে। কিন্তু আপনারা বিশ্বাস করুন, এখন ওই ছেলের সঙ্গে আমার আর কোনো সম্পর্ক নেই। তবু এটা আমার স্বামী বিশ্বাস করতে চাইছে না। ওই ছেলেটা বিয়ে করে সংসারী হয়েছে। কিন্তু তবু আমার স্বামী ওকে নিয়ে আমাকে সন্দেহ করে চলেছে। এই নিয়ে সব সময় খুব মানসিক চাপে থাকি। এখন আমার মা–বাবা আমার বাড়িতে বেড়াতে এসেছে। ওদের সামনে ও আমাকে যা নয় তাই বলে অকথ্য ভাষা ব্যবহার করছে। ফলে তাঁরা খুব হীনম্মন্যতায় ভুগছেন।


নাম ও ঠিকানা প্রকাশে অনিচ্ছুক

*তোমাদের সম্পর্কটি তিন বছর ধরে চলছে এবং প্রতিদিন তোমরা কিছু সময় কথা বলছ জেনে মনে হচ্ছে, সম্পর্কটির মধ্যে ইতিবাচক দিক নিশ্চয়ই রয়েছে। তবে ফোন করার ক্ষেত্রে কার আগ্রহ বেশি রয়েছে, সীমিত সময় কথা বলার বা দেখা না হওয়ার পেছনে কারণগুলো কী, তা জানতে পারিনি। মেয়েটি কি তোমার সঙ্গে এখন আর দেখা করতে চাইছে না? তুমি লিখেছ, তার কথার ধরন তোমাকে তৃপ্ত করছে না। তুমি কি তার সঙ্গে সহমর্মিতা দেখাচ্ছ? ওর মনকে স্পর্শ করে এমন কিছু কথা বলছ, নাকি সম্পর্কের অবনতির জন্য ওকেই দায়ী করছ। একটি সম্পর্কে তো দুটো মানুষকেই একইভাবে অবদান রাখতে হয়। পরস্পরের খুব ভালো বন্ধুও হতে হয়। ওর দিক থেকে যদি আবেগের প্রকাশ কমে গিয়ে থাকে, তাহলে তুমি তাকে সরাসরি জিজ্ঞেস করতে পারো, সে এই সম্পর্কটি এখন কীভাবে দেখছে। ওকে কোনো রকম দোষারোপ না করে তুমি যা ভাবছ এবং অনুভব করছ, তা ওকে বুঝতে সাহায্য করো। দেখা করে তোমরা খোলাখুলি আলোচনা করে দুজনেই বুঝতে চেষ্টা করো একজন অন্যজনকে আগের মতোই ভালোবাসছ কি না বা সম্পর্কের গুণগত মানটিতে কোনো পরিবর্তন এসেছে বলে মনে হচ্ছে কি না। সেটি হয়ে থাকলে তোমাদের কী করণীয়, তা নিয়ে খুব সততা ও বস্তুনিষ্ঠভাবে দুজনেই নিজস্ব মতামত প্রকাশ করে ভবিষ্যৎ নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার চেষ্টা করো।

*মানুষ অনেক স্বপ্ন নিয়ে বিবাহিত জীবনটি শুরু করে। বিয়ের মাত্র দুদিনের মাথায় তুমি অনেক বড় একটি ধাক্কা খেলে। একটি সম্পর্কে বিশ্বাস হচ্ছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি স্তম্ভ। অথচ সেটি ভেঙে গুঁড়িয়ে গেল যখন জানতে পারলে, তুমি প্রতারিত হয়েছ। বিয়ের আগে অনেকেই ভালোবাসার সম্পর্কে থাকে, কিন্তু বিয়ের পরও সম্পর্কটি চালিয়ে যাওয়া বা নতুন কোনো সম্পর্কে জড়ানো অনৈতিক ও অগ্রহণযোগ্য। তুমি প্রতারণা, অবিশ্বাস, অবহেলা, অশ্রদ্ধা ও মানসিক নির্যাতনের মধ্যে দীর্ঘ নয় বছর এই সম্পর্কটি যে কারণে চালিয়ে গেছ, তার একটি ব্যাখ্যা হয়তো তোমার কাছে আছে। তবে এত বড় একটি সময় এটির ভেতরে থাকা খুবই ক্লান্তিকর ও অবসাদময় হওয়ার কথা। তুমি স্বামীকে হয়তো ভালোবাস বলে আশায় বুক বেঁধে দুটো সন্তানকেও পৃথিবীতে নিয়ে এসেছ। তবে ওরা কিন্তু বাবা-মায়ের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের বহিঃপ্রকাশ দেখে বড় হচ্ছে না। উপরন্তু তারা একটি চলমান সংঘাতময় সম্পর্ক দেখতে পাচ্ছে। এতে করে ওদের মনে প্রবল ভীতির সৃষ্টি হচ্ছে, যেটির প্রভাব তাদের ব্যক্তিত্বের বিকাশকে অত্যন্তÿক্ষতিগ্রস্ত করার কথা। তুমি তো অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী এবং শিক্ষিত একটি মানুষ, তারপরও কী ভেবে নিজেকে এই অবমাননাকর পরিস্থিতিতে খাপ খাইয়ে চলেছ, তা খুব ভালো করে ভেবে দেখো। তোমার স্বামী কি নিজের অপরাধবোধ কমাবার জন্য তোমাকে একটি বিবাহপূর্ব সম্পর্ক নিয়ে নির্যাতন করছেন কি না জানি না। ব্যাপারটি নিয়ে তাঁকে আর কোনো ব্যাখ্যা দিয়ে নিজের ক্লান্তি বাড়তে দিয়ো না। নিজেকে আন্তরিকভাবে ভালোবেসে, শ্রদ্ধা করে এবং পরিপূর্ণভাবে নিজের যত্ন নিয়ে পথ চলতে চেষ্টা করো। পাশের মানুষটি তোমার আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করবে, সেই ক্ষমতাটি তাঁকে না দিয়ে তুমিই নিজের আবেগের নিয়ন্ত্রক হওয়ার চেষ্টা করো। অর্থাৎ কিসে তুমি কষ্ট পাবে বা খুশি হবে, সেই সিদ্ধান্ত যেন তোমারই হয়, সেই লক্ষ্যে মানসিক শক্তিটি বাড়াতে থাকো। আশা রাখছি নিজের কোনো ক্ষতি করবে না। কারণ, তোমার জীবন অনেক মূল্যবান। যদি খুব বেশি কষ্ট হয়, তাহলে ০৯৬১২২২২৩৩৩ এই টেলিসেবা নম্বরটিতে ফোন করে কাউন্সেলিং সেবা নিজে পারো। যেসব সংস্থায় কাউন্সেলিং ও সাইকোথেরাপির সুযোগ আছে, সেসব জায়গায় গিয়ে তুমি কীভাবে মানসিকভাবে ভালো থাকতে পারো, সেটির জন্য সরাসরি সেবা গ্রহণ করতে পারো।